Monday, September 26, 2022
Homeসব খবরজাতীয়তেল নিয়ে তেলেসমাতি

তেল নিয়ে তেলেসমাতি

অতি অল্প সময়ের মাঝে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি আগুনে ঘি ঢালার মতো হয়ে গেছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী। দাম বাড়ানোর ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানের পেট্রল পাম্পে দেখা গেছে ভোক্তাদের উপচে পড়া ভিড়। একইভাবে বিভিন্ন পেট্রোল পাম্পে দেখা গেছে তেল দেওয়া বন্ধ রাখতে। দেশের বিভিন্ন রুটে চলাচল করা পরিবহনের ভাড়া বাড়ানোর বিষয়েও তথ্য জানা গেছে। তবে এখনই কোনো মন্তব্য করতে রাজি নয় বাস মালিক সমিতি ও ট্রাক-কাভার্ভভ্যান মালিক-শ্রমিক সমন্বয় পরিষদের নেতারা।

শুক্রবার (৫ আগস্ট) বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপপ্রধান তথ্য অফিসার মীর মোহাম্মদ আসলাম উদ্দিনের সই করা সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কথা জানানো হয়। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি), ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডে (ইআরএল) পরিশোধিত এবং আমদানি/ক্রয় করা ডিজেল, কেরোসিন, অকটেন ও পেট্রোলের মূল্য সমন্বয় করে ভোক্তা পর্যায়ে পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয় প্রজ্ঞাপনে।

এতে বলা হয়, শুক্রবার (৫ আগস্ট) রাত ১২টার পর থেকে ডিপোর ৪০ কিলোমিটারের ভেতর ভোক্তা পর্যায়ে খুচরা মূল্য ডিজেল ১১৪ টাকা প্রতি লিটার, কেরোসিন ১১৪ টাকা প্রতি লিটার, অকটেন ১৩৫ টাকা প্রতি লিটার ও পেট্রোল ১৩০ টাকা প্রতি লিটার হবে। এর আগে ভোক্তা পর্যায়ে খুচরা মূল্য ছিল প্রতি লিটার ডিজেল ৮০ টাকা, কেরোসিন ৮০ টাকা, অকটেন ৮৯ টাকা ও পেট্রল ৮৬ টাকা।

তেলের জন্য বি’ক্ষোভ: জ্বালানি তেলের এই মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে রাজধানীর আবদুল্লাহপুর, আসাদগেট, মৎস্য ভবন এলাকার ফিলিং স্টেশন বন্ধ দেখা গেছে। আবার খিলক্ষেতসহ একাধিক এলাকার ফিলিং স্টেশনে দেখা যায় মোটরবাইক ও প্রাইভেট কার থেকে শুরু করে গণপরিবহনের লম্বা লাইন। এ সময় কাঙ্ক্ষিত তেল না পেয়ে অনেককে বিক্ষোভও করতে দেখা যায়।

বিভিন্ন পরিবহন সংশ্লিষ্ট কাউন্টারের কমকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে ঢাকা থেকে খুলনা রুটে চলাচলকারী ফাল্গুনি পরিবহন শনিবার সকাল থেকে ১০০ টাকা বাড়িয়েছে। এ ছাড়া ঢাকা থেকে সাতক্ষীরা ও পিরোজপুর রুটে চলাচলকারী ইমাদ পরিবহন বাড়িয়েছে ৫০ টাকা। তবে সরকারি সিদ্ধান্ত এলে তখন বাকিটা কার্যকর করবে বলেও জানিয়েছে তারা।

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণার পরে কুমিল্লা জেলা বাস মালিক সমিতির সভাপতি ও এশিয়া এয়ারকন পরিবহনের মালিক জলিশ আবদুর রউফ তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় সারাবাংলাকে বলেন, ‘আগামীকাল (শনিবার, ৬ আগস্ট) ঢাকায় কেন্দ্রীয়ভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। প্রজ্ঞাপনের পূর্ণাঙ্গ কপি পাওয়ার পরে বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে যেভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে আমরা সেই হিসেবে কার্যকর করব।’

বাড়ছে পরিবহন ভাড়াও: ঢাকা-কুমিল্লা-ঢাকা রুটে চলা আরেক পরিবহন মিয়ামি এয়ারকনের মালিক মো. শাহিন সারাবাংলাকে বলেন, ‘গতবার যখন তেলের মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছিল তখন যাত্রীদের কথা বিবেচনায় নিয়ে আমরা ভাড়া বাড়ায়নি। আমাদের রুটে অন্যরা ৩০০ টাকা ভাড়া নিলেও আমরা ২৫০ টাকা করে ভাড়া নিয়ে যাত্রীদের সেবা দিয়ে গেছি। কিন্তু এবারের জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির কারণে আগামীকাল আমাদের আবার সিদ্ধান্তে বসতে হবে। তখন আসলে জানানো সম্ভব হবে সামনের দিনগুলির করণীয় বিষয়ে।’

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সমিতির মহাসচিব ও এনা পরিবহনের মালিক খোন্দকার এনায়েত উল্যাহ এখনই কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। একইভাবে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ওসমান আলীও প্রজ্ঞাপন না পাওয়ায় কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

তেলের দাম প্রত্যাহার চায় যাত্রী কল্যাণ সমিতি: সামগ্রিক বিষয়ে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী সারাবাংলাকে বলেন, ‘এই সিদ্ধান্ত আমাদের জন্য বিপদ বয়ে আনতে পারে। এর আগেরবার জ্বালানি তেলের যে মূল্যবৃদ্ধি ছিল তা কিন্তু বেশি সময় হয়নি। এখন আবার বাড়ানো হয়েছে হুট করেই বলা যায়। এই সিদ্ধান্তটা সঠিক সময়ে নেওয়া হয়েছে কিনা বা সিদ্ধান্তটি সঠিক হয়েছে কিনা তা ভাবা প্রয়োজন সরকারের। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে- এটা সত্য কথা। কিন্তু বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম কিন্তু এখন আবার নিম্নমুখী- এই তথ্যটাও বিবেচনা করতে হবে।

এই অবস্থায় আমাদের কিন্তু গতবারের মূল্যবৃদ্ধির পরে পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ ছিল। সেটি না করে হঠাৎ করে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্তটি দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কারণে যে আগুন জ্বলার মতো পরিস্থিতি জনজীবনে সেখানে এই সিদ্ধান্ত ঘি ঢেলে দেওয়ার মতো হয়ে গেছে। জনজীবনে নানাভাবে এর কারণে প্রভাব দেখা দিতে পারে। ইতোমধ্যেই আমরা দেখছি যে আমাদের দেশে চাল, ডালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের বাজারে যে ঊর্ধ্বগতি সেটাতে আরও বেশি উসকানি দেওয়া হলো।’

তিনি বলেন, ‘প্রতিবার তেলের দাম যে পরিমাণে বৃদ্ধি পায় তার চাইতে কয়েক গুণ বেশি বাড়ে পরিবহন ভাড়া। গণপরিবহনে তেলের মূল্য বৃদ্ধির অনেক গুণ বেশি আদায় করা হয় জনগণের কাছ থেকে। আমাদের এখানে সরকার পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধি কতটুকু হবে সেটা নির্ধারণ করে দিলেও পরে দেখা যায় তারাই সেটি কার্যকর রাখতে পারেন না। উল্টোদিকে পরিবহন মালিকরা যেটা বাড়িয়ে থাকেন সেটাই কার্যকর হয় ও সাধারণ মানুষের পকেট থেকেই সেটা কাটা যায়।’

তিনি আরও বলেন, ‘সর্বোপরি বলা যায় জ্বালানি তেলের দাম না বাড়ালে যে পরিমাণ ক্ষতি হতো তার চাইতেও আট থেকে ১০ গুণ বেশি ক্ষতি হবে বর্তমানে যে টাকা কাটা হবে জনগণের পকেট থেকে। সুতরাং আমি মনে করি জ্বালানি তেলের বর্ধিত মূল্য প্রত্যাহার করা প্রয়োজন। যেহেতু আন্তর্জাতিক বাজার এখন নিম্নমুখী তাই সেটা পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। সেক্ষেত্রে যদি নিম্নমুখী প্রবণতার ধারায় আগের অবস্থানে ফিরে যায় তখন এই মূল্যবৃদ্ধিটা আসলে ক্ষতি বয়ে আনবে অনেক ক্ষেত্রে। একটু যদি লক্ষ্য করি আমরা তবে দেখা যায় যে ভোজ্যতেলের মূল্যও কিন্তু বৃদ্ধি পেয়েছিল বিশ্ববাজারে যার প্রভাবে আমাদের দেশেও। কিন্তু সেটা এখন বিশ্ববাজারে কমে আসার সঙ্গে সঙ্গে প্রভাব পড়েছে আমাদের দেশেও। আর তার ফলে সেটি কমে আসছে।’

সরকারের প্রতি অনুরোধ রাখবো বর্ধিত জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির প্রজ্ঞাপন বাতিল করে বাজার স্থিতিশীল রাখার জন্য- যোগ করেন বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী।

সরকার নিরুপায়: এর আগে গত বছরের ৩ নভেম্বর জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়। সেসময় জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ডিজেল ও কেরোসিনের মূল্য প্রতি লিটারে ভোক্তা পর্যায়ে ১৫ টাকা বাড়ানো হয়েছে। অর্থাৎ কেরোসিন ও ডিজেল ৬৫ টাকা থেকে বেড়ে ৮০ টাকা করা হয়েছিল। তবে সে সময় অকটেন ও পেট্রোলের দাম বাড়ানো হয়নি।

এ বিষয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, ‘জনবান্ধব আওয়ামী লীগ সরকার সবসময় আমজনতার স্বস্তি ও স্বাচ্ছন্দ্য বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়। যতদিন সম্ভব ছিল ততদিন সরকার জ্বালানি তেলের মূল্য বাড়ানোর চিন্তা করেনি। অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে অনেকটা নিরুপায় হয়েই কিছুটা অ্যাডজাস্টমেন্টে যেতে হচ্ছে। ২০১৬ সালের এপ্রিল মাসে সরকার জ্বালানি তেলের মূল্য কমিয়ে দিয়েছিল। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে সে অনুযায়ী জ্বালানি তেলের মূল্য পুনঃবিবেচনা করা হবে।’

Advertisement