Saturday, December 10, 2022
Homeঅন্যান্যচাঁদপুরের মাছঘাটে ইলিশের ছড়াছড়ি, দামে নাখোশ ক্রেতারা

চাঁদপুরের মাছঘাটে ইলিশের ছড়াছড়ি, দামে নাখোশ ক্রেতারা

মাছ পছন্দ করেন না, এমন মানুষ খুবই কম আছেন। এ জন্যই তো আমাদের বলা হয় মাছে ভাতে বাঙালি। আর সেটা যদি হয় ইলিশ মাছ তাহলে তো কথাই নেই। এ ইলিশের জন্য বিখ্যাত জেলা হচ্ছে চাঁদপুর। ইলিশের কথা মাথায় আসলেই চাঁদপুরের কথা আপনা আপনি মনে পড়ে। এ ইলিশকে ঘিরে প্রায় একশ’ বছর আগে চাঁদপুরের ডাকাতিয়া নদীর পাড়ে গড়ে ওঠে বিশাল হাট। সে হাট চাঁদপুর মাছঘাট হিসেবে পরিচিত। এটি চাঁদপুর বড় স্টেশনে অবস্থিত। দেশের অন্যতম বৃহৎ ইলিশ অবতরণ কেন্দ্র এটি।

সরেজমিনে মাছঘাটে গিয়ে দেখা যায় ক্রেতা-বিক্রেতা-আড়ৎদার সবাই ব্যস্ত সময় পার করছেন। মানুষের এ কোলাহলময় হাটে কেনাবেচার বিচিত্র লীলা চলেছে। হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতির কারণে যেন তিল ধরার ঠাঁই নেই এখানে। কেউ ব্যস্ত মাছ ট্রাকে তোলায়, কেউ মাছ কেনায়, কেউ বিক্রি নিয়ে।

দূর-দূরান্ত থেকে হাটে এসে ভিড় জমিয়েছে নানা পেশার মানুষ। আশপাশের জেলা ও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকেও অনেকেই এখানে এসেছেন। রাজধানী ঢাকা থেকে পরিবার, বন্ধুদের নিয়ে ঘুরতে এসেছেন অনেকে। উদ্দেশ্য একটাই, সেটা হচ্ছে চাঁদপুরের রুপালি ইলিশ খাওয়া আর ফেরার সময় সঙ্গে নিয়ে যাওয়া।

হাটে কথা হয় সুরিদ নামে এক ক্রেতার সঙ্গে। তিনি বলেন, আমি ঢাকা থেকে পরিবার নিয়ে এসেছি। অনেকদিন থেকে চাঁদপুরের ইলিশের গল্প শুনেছি। অবশেষে চলে আসলাম। এসে বেশ ভালো লেগেছে। ঘুরাও হলো আর ইলিশ কেনাও হলো।

কত টাকার মাছ কিনলেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ২১ হাজার টাকার ইলিশ কিনেছি। আর সহজে আসা হবে কিনা তার তো ঠিক নেই। তাই মন মতো কিনে নিয়েছি। আরেক ক্রেতার সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, মাত্র হাটে এসেছি। এত ভিড় হবে ভাবিনি। এখনো মাছ কেনা হয়নি। দরদাম করছি। মন মতো হলে নিয়ে নেব।

মাছঘাটে কথা হয় ইমরান নামে এক ইলিশ বিক্রেতার সঙ্গে। তিনি বলেন, বিভিন্ন সাইজের মাছের দাম বিভিন্ন রকম। বড় সাইজের মাছ, অথ্যাৎ ২ কেজির উপরের মাছ প্রতি কেজিতে ১৮০০ থেকে ২২০০ টাকার মধ্যে বিক্রি হয়। ১ কেজি কিংবা দেড় কেজির ইলিশ কেজি প্রতি ১৩০০ থেকে ১৫০০ টাকায় বিক্রি হয়। আর ছোট সাইজের মাছের দাম আরও কম।

রফিকুল ইসলাম নামে এক আড়ৎদার বলেন, চলমান বাজারে মাছের দাম বেশিও না আবার কমও না। এক কেজি কিংবা ১২০০ গ্রাম মাছের দাম ছিল ১৬০০ থেকে ১৭০০ টাকা। এখন দাম চলছে ১৩০০ থেকে সাড়ে ১৩শ’ টাকা। আর চাঁদপুরের আসল ইলিশ ২ কেজির টা হলে কেজি প্রতি ১৮শ’ থেকে ২ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। সামনে মাছের দাম কমবে না বাড়বে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট করে কিছু বলতে পারছি না। কারণ মাছ কম আসলে দাম বাড়বে আর মাছ বেশি আসলে দাম কমবে।

হাটের বাইরে কাগজ কলম হাতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে এক যুবককে। অন্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায় তাদের সর্দার বলা হয়। কর্কশীটের বক্সে করে যে মাছ নেওয়া হয়। সে বক্সের হিসেব রাখেন তিনি। এ সময় মাছঘাটের সামনে ট্রাকে ইলিশ তুলতে দেখা যায় অনেককেই। জানতে চাইলে তারা জানায়, এখান থেকে সারা দেশেই ইলিশ যায়। এ ট্রাকের মাছগুলো যাবে ঢাকায়। ঢাকায় পৌঁছাতে পৌঁছাতে মাছগুলো নষ্ট হয়ে যাবে না? উত্তরে একজন জানান, বরফ দিয়ে সেভাবেই মাছগুলো নেওয়া হয়ছে, সমস্যা হবে না। ইলিশগুলো তাজা মাছের মতোই থাকবে।

হাটের বাইরে ইব্রাহিম নামে এক যুবককে কর্কশীটের বাক্স মাথায় নিয়ে যেতে দেখা যায়। এগিয়ে গিয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান বক্সে ইলিশ আছে। হাটতে হাটেতে তার সঙ্গে গল্পের ছলে বেশ কিছুক্ষণ কথা হয়। কথায় কথায় তিনি বলেন, আমি এখানে শ্রমিক হিসেবে কাজ করি। হাট থেকে কেউ মাছ কিনলে সে মাছ আমি মাথায় করে গাড়ি পর্যন্ত দিয়ে আসি। এ কাজের জন্য কেউ ৫০ টাকা আবার কেউ ১০০ টাকা দেয়। তিনি আরও বলেন, এ হাটে মাছ কিনতে হলে সকালে আসাই ভালো। কারণ সকালে তাজা ইলিশ পাওয়া যায়।

তাজা ইলিশ চেনার উপায় কি? এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, তাজা ইলিশ কিছুটা লাল থাকে। বরফ দেওয়া ইলিশে সে লালছে রঙটা থাকে না। এখানে এমনও মাছ আছে যেগুলো ৫-৬ দিন আগের। যারা নতুন ইলিশ কিনতে আসেন তারা অনেকেই বুঝেন না কোনটা তাজা ইলিশ আর কোনটা পুরোনো। তবে বরফে রাখায় মাছগুলো ভালো থাকে।

ইলিশ নিয়ে কথা হলে চাঁদপুর মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষক ড. আনিসুর রহমান বলেন, এ বছর প্রতি ১০০ ইলিশের মধ্যে ৫১টি ডিম ছাড়ার সুযোগ পেয়েছে। ইলিশের উৎপাদন এবার বেশ ভালো। বৃষ্টি কম হওয়ার কারণে মাঝে মাঝে ইলিশ কম পাওয়া গেলেও পূর্ণিমার সময় ইলিশের আনাগোনা বেড়ে যায়। আর সামনের সময়টায় আশা করা যায় নদী থেকে অধিক পরিমাণ ইলিশ পাওয়া যাবে।

তিনি বলেন, ৭ অক্টোবর থেকে ২৮ অক্টোবর পর্যন্ত ২২ দিন ইলিশ ধরায় নিষেধাজ্ঞা থাকবে। এ নিষেধাজ্ঞা না দিলে পরের বছর ইলিশ পাওয়া যাবে না। তাই বছরের নির্দিষ্ট সময়ে ইলিশ ধরায় নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়ে থাকে। এটা আমদের সবাইকে মেনে চলতে হবে। বিশেষ করে জেলেদের এ আদেশ মেনে চলতে হবে। তাহলে ইলিশের সহনশীল উৎপাদন বজায় থাকবে।

তিনি আরও বলেন, এ বছর এখন পর্যন্ত ৫ লাখ ৬৫ হাজার মেট্রিক টন ইলিশ পাওয়া গেছে। এটি ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করছি। আমাদের দেশের নদীগুলো ইলিশের প্রজননের জন্য উপযোগী? জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের নদীগুলোর মোহনা অঞ্চলে পলি পড়ে নাব্যতা সংকট সৃষ্টি হচ্ছে। এ অঞ্চল দিয়ে ইলিশ সাগর থেকে প্রজননের উদ্দেশ্যে নদীতে আসে। নাব্যতা সংকটের কারণে তাদের সমস্যা হয়। এছাড়া চর-ডুবোচর, নদীতে থাকা নানা জাতের জাল, অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলন ইত্যাদি ইলিশের জন্য হু’মকি।

Advertisement